কিডনি ইনফেকশন এক ধরনের গুরুতর অসুখ, যা কিডনিতে ঘটে। কিডনি আমাদের শরীর থেকে ময়লা ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেয়। যখন কিডনিতে ইনফেকশন হয়, তখন কিডনি এই কাজগুলো ঠিকমতো করতে পারে না, যা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
এই লেখায় আমরা কিডনি ইনফেকশনের লক্ষণ, কেন এটি হয়, এবং কীভাবে এটি আটকানো যায় তা সহজভাবে জানাবো।
কিডনি ইনফেকশনের লক্ষণসমূহ

কিডনি ইনফেকশনের লক্ষণগুলো অনেক সময় মূত্রনালীর ইনফেকশন (UTI)-এর মতো মনে হতে পারে। তবে, কিডনি ইনফেকশন হলে সমস্যা আরও বড় হতে পারে এবং কিছু বাড়তি লক্ষণ দেখা দিতে পারে। নিচে কিডনি ইনফেকশনের সাধারণ লক্ষণগুলো সহজভাবে বলা হলোঃ
- পিঠের বা কোমরের ব্যথা: কিডনি ইনফেকশনের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো কোমরের পাশ থেকে পিঠে তীব্র ব্যথা। এই ব্যথা সাধারণত একপাশে বেশি দেখা যায়।
- উচ্চ তাপমাত্রা বা জ্বর: কিডনি ইনফেকশনের ফলে শরীরে উচ্চ তাপমাত্রা (১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি) হতে পারে। সঙ্গে শীত শীত ভাব বা কাঁপুনি অনুভব হতে পারে।
- ঘনঘন প্রস্রাব: যদি হঠাৎ করে ঘনঘন প্রস্রাব করার প্রয়োজন অনুভব করেন বা প্রস্রাবের সময় ব্যথা হয়, তবে এটি কিডনি ইনফেকশনের একটি লক্ষণ হতে পারে।
- প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া: কিডনি ইনফেকশন হলে প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া, ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব হয়।
- প্রস্রাবের রঙ পরিবর্তন: কিডনি ইনফেকশন থাকলে প্রস্রাবের রঙ ঘন হলুদ, বাদামী বা কখনও কখনও রক্তের মতো লালচে হতে পারে।
- বমি বা বমিভাব: কিডনি ইনফেকশন শরীরের পক্ষে খুবই ক্লান্তিকর হতে পারে, যার ফলে বমি বা বমিভাব হতে পারে।
- শরীরের দুর্বলতা: ইনফেকশনের কারণে শরীর দুর্বল ও ক্লান্ত লাগতে পারে। এক্ষেত্রে আপনার দৈনন্দিন কাজ করতে অসুবিধা হতে পারে।
- পেট ব্যথা: কোমরের পাশাপাশি পেটের নিচের দিকে ব্যথা অনুভব হলে সেটিও কিডনি ইনফেকশনের ইঙ্গিত হতে পারে।
কিডনি ইনফেকশনের কারণ
কিডনি ইনফেকশন সাধারণত ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয়। এই ইনফেকশন ইউরিনারি ট্র্যাক্ট (মূত্রনালী) থেকে কিডনিতে চলে যায় এবং সেখানে সমস্যা সৃষ্টি করে। নিচে কয়েকটি সাধারণ কারণ তুলে ধরা হলোঃ
- ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI): ইউরিনারি ট্র্যাক্টে সংক্রমণ হলে তা সহজেই কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
- দীর্ঘস্থায়ী ইউরিনারি অবস্ট্রাকশন: মূত্রনালীর কোনও ব্লকেজ থাকলে কিডনিতে ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- অপর্যাপ্ত পানি পান: পানি কম পান করলে ইউরিনারি সিস্টেমে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে।
- ডায়াবেটিস বা অনিয়ন্ত্রিত ব্লাড সুগার: ডায়াবেটিস থাকলে কিডনি ইনফেকশনের ঝুঁকি বেড়ে যায় কারণ উচ্চ রক্তে শর্করা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে।
কিডনি ইনফেকশন থেকে বাঁচতে করনীয়
কিডনি ইনফেকশন প্রতিরোধে নিচের কিছু পরামর্শ অনুসরণ করা যেতে পারেঃ
- পানি পান: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এটি আপনার কিডনি সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ঝুঁকি কমাবে।
- প্রস্রাব ধরে রাখবেন না: যখনই প্রস্রাবের প্রয়োজন হবে তখনই প্রস্রাব করুন, এটি ইউরিনারি ট্র্যাক্টে ব্যাকটেরিয়া জমার ঝুঁকি কমায়।
- সঠিক হাইজিন মেনে চলুন: প্রস্রাবের পর সঠিকভাবে পরিষ্কার করুন। মহিলাদের ক্ষেত্রে সামনে থেকে পেছনে পরিষ্কার করা উচিত যাতে ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে না পারে।
- সুস্থ খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন: প্রোটিন, শাকসবজি, ফলমূল এবং শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন।
কখন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে
যদি উপরের কোনও লক্ষণ দেখা দেয় এবং তা কয়েকদিন ধরে চলতে থাকে, তবে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করা না হলে কিডনি ইনফেকশন থেকে কিডনি ফেলিওর, রক্তে সংক্রমণ বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সতর্কীকরণ: কিডনি ইনফেকশন একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা চিকিৎসার জন্য অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। দেরি করলে এই সমস্যা আরও বড় হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে আপনি কিডনি ইনফেকশনের লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
কিডনি ইনফেকশন হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায়?
কিডনি ইনফেকশন হলে নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে:
তীব্র পিঠে বা কোমরের ব্যথা
উচ্চ তাপমাত্রা বা জ্বর এবং কাঁপুনি
ঘনঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া করা
প্রস্রাবের রঙ ঘন হলুদ, বাদামী বা রক্তের মতো লালচে
বমি বা বমিভাব
শরীরের দুর্বলতা ও ক্লান্তি
কিডনির সমস্যা হলে কি কি সমস্যা দেখা দেয়?
কিডনির সমস্যা হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন:
প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা অস্বস্তি
শরীর ফুলে যাওয়া (বিশেষ করে পায়ে ও মুখে)
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা প্রস্রাবের সময় পরিবর্তন
রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
বমিভাব বা খাওয়ায় অনীহা
কিডনির ব্যথা কোথায় করে?
কিডনির ব্যথা সাধারণত পিঠের নীচের অংশে বা কোমরের পাশে অনুভূত হয়। এই ব্যথা সাধারণত একপাশে বেশি থাকে এবং তীব্র হতে পারে।
কিডনি ভালো আছে কিনা বোঝার উপায়?
কিডনি ভালো আছে কিনা তা বোঝার জন্য কিছু লক্ষণ পর্যবেক্ষণ করতে পারেন:
প্রস্রাব স্বাভাবিক রঙের এবং কোনও জ্বালাপোড়া নেই
শরীরে কোনও অস্বাভাবিক ফোলাভাব নেই
নিয়মিতভাবে প্রস্রাবের প্রয়োজন হচ্ছে
রক্তচাপ স্বাভাবিক মাত্রায় রয়েছে
যদি উপরের কোনও লক্ষণ দেখা না যায়, তবে সাধারণত ধরে নেওয়া যায় যে কিডনি ভালো আছে। তবে কিডনির সুস্থতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিডনির নরমাল পয়েন্ট কত?
কিডনির কার্যক্ষমতা যাচাই করতে সাধারণত ‘গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট’ (GFR) ব্যবহার করা হয়। একজন সুস্থ ব্যক্তির GFR সাধারণত ৯০ বা তার উপরে থাকে। ৯০-এর নিচে GFR থাকলে কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে শুরু করে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।