আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা: কী খাবেন, কী খাবেন না

আমাশয় বা গ্যাস্ট্রোএন্টারাইটিস হলো আমাদের পেটের ভেতরের অংশের সংক্রমণ। আমাশয় সাধারণত পচা খাবার, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পোকামাকড়ের মতো ছোট জীবাণুর কারণে হয়। তাই আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা ভালো খাবার রাখা উচিত। কারণ এই অসুখ হলে পেটে ব্যথা, পাতলা পায়খানা, বমি ও হজমের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

আমাশয় হলে আপনাকে কিছু খাবার এড়িয়ে চলতে হবে এবং দ্রুত সুস্থতার জন্য কিছু খাবার খেতে হবে নিচে এগুলোর তালিকা দেওয়া হল:

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার, কারণ এই সময়ে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার শরীরকে দ্রুত আরোগ্য লাভে সহায়তা করে। হালকা, কম মসলাযুক্ত খাবার এবং তরল খাবার গ্রহণ এ সময়ে খুবই কার্যকর। পানির অভাব দূর করতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও অন্যান্য তরল খাবার খাওয়া উচিত।

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা
আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা: কী খাবেন, কী খাবেন না

তবে আমাশয় রোগীর খাবার তালিকায় এমন কিছু খাবার রয়েছে, যা এই সময়ে খাওয়া উচিত নয়। ভাজাপোড়া, মসলাযুক্ত এবং গ্যাস সৃষ্টি করে এমন খাবার আমাশয়ের জন্য ক্ষতিকর। পাশাপাশি, খুব মিষ্টি বা অত্যধিক চিনি যুক্ত খাবারও পেটের জন্য ভারী হতে পারে এবং এড়ানো উচিত। নিচে আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা দেওয়া হলো, যা দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে।

আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া যাবে?

আমাশয় হলে বাংলাদেশে প্রচলিত যে ধরনের খাবার খাওয়া যেতে পারে, সেসব খাবারের তালিকা নিচে চার্ট আকারে দেওয়া হলো। এতে রয়েছে সহজপাচ্য, পুষ্টিকর এবং পেটের আরামদায়ক খাবার, যা আমাশয় থেকে দ্রুত আরোগ্য পেতে সহায়ক হতে পারে।

ক্রমিকখাবারের নামবিবরণ
সাদা ভাতসহজপাচ্য এবং পুষ্টিকর, শরীরে শক্তি যোগায়
মুড়িহালকা খাবার যা সহজে হজম হয়
সেদ্ধ আলুমচমচে নয় এমন সেদ্ধ আলু আমাশয় রোগীর জন্য উপকারী
ডালপাতলা করে রান্না করা ডাল সহজপাচ্য এবং প্রোটিন যোগায়
খিচুড়িসাদা চাল এবং মুগ ডালের পাতলা খিচুড়ি সহজে হজম হয়
সাদা পাউরুটিকম আঁশযুক্ত এবং সহজপাচ্য
সবজি স্যুপবেছে নেওয়া সবজি দিয়ে পাতলা স্যুপ, পুষ্টি যোগায়
সেদ্ধ ডিমের সাদা অংশহজমে সহজ এবং প্রোটিন সমৃদ্ধ
পাকা কলাহালকা ও সহজপাচ্য, দ্রুত এনার্জি প্রদান করে
১০ডাবের পানিপানিশূন্যতা রোধ করে এবং শরীরে ইলেক্ট্রোলাইট যোগায়
১১হালকা চাদুধবিহীন চা পাকস্থলীর আরামদায়ক
১২সেদ্ধ মাংসসামান্য পরিমাণে লবণ ছাড়া সেদ্ধ করা মাংস প্রোটিন সরবরাহ করে
১৩টক দইহজমে সহায়ক এবং প্রোবায়োটিক
১৪পাতলা সেমাইহালকা ও সহজে হজম হয়
১৫মিষ্টি কুমড়া সেদ্ধসহজপাচ্য এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ
১৬সেদ্ধ লাউপাকস্থলীতে আরাম দেয় এবং সহজপাচ্য
১৭শাকের স্যুপপাতলা করে রান্না করা শাকের স্যুপ ভিটামিন যোগায়
১৮পেঁপে সেদ্ধসহজে হজম হয় এবং আমাশয়ে সহায়ক
১৯কুসুম গরম পানিহজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে
২০আপেলের রসস্বাভাবিক শর্করা যোগায় এবং হালকা পানীয়
আমাশয় রোগীর খাবার তালিকায় এই খাবারগুলো রাখা যেতে পারে

এই চার্টের খাবারগুলো বাংলাদেশে সহজেই পাওয়া যায় এবং আমাশয় রোগের রোগীর জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর।

আমাশয় হলে কি খাবার খাওয়া যাবে না?

আমাশয় হলে বাংলাদেশে প্রচলিত যেসব খাবার খাওয়া এড়ানো উচিত, সেই খাবারগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই খাবারগুলো পেটের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, তাই আমাশয় অবস্থায় এগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকাই ভালো।

ক্রমিকখাবারের নামকেন এড়ানো উচিত
তেল ও মসলাযুক্ত খাবার (যেমন ভাজাপোড়া, সিঙ্গারা, চপ)হজমে কঠিন হতে পারে, পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে এবং গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে
গরুর মাংসপাকস্থলীর জন্য কঠিন হতে পারে, হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে
ভাজা-পোড়া খাবারঅতিরিক্ত তেল এবং মসলা থাকায় পেটে ব্যথা ও গ্যাস বাড়ায়
মিষ্টি খাবার (যেমন মিষ্টি, পায়েস)অধিক চিনি পেটের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে, গ্যাস এবং পেট ফোলা সৃষ্টি করতে পারে
আচারঅ্যাসিডিক উপাদান থাকে, যা অন্ত্রে সংক্রমণ বাড়াতে পারে
দুধদুধ হজমে কঠিন হতে পারে এবং ডায়রিয়া বা পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে
বাঁধাকপিগ্যাস তৈরি করতে পারে, যা পেটের ব্যথা এবং অস্বস্তি বাড়ায়
চিংড়িআলার্জি সৃষ্টি করতে পারে এবং হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে
লাল মাংসহজমে কঠিন এবং গ্যাস তৈরি করতে পারে
১০কাঁচা সবজি (যেমন শশা, টমেটো)গ্যাস এবং ফোলাভাব সৃষ্টি করতে পারে, যা পেটে ব্যথা বাড়ায়
১১বেগুনপাকস্থলীতে অস্বস্তি এবং গ্যাস তৈরি করতে পারে
১২কোল্ড ড্রিংকসপানিশূন্যতা বাড়ায় এবং গ্যাস তৈরি করতে পারে
১৩কফিক্যানফেইন অন্ত্রে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে এবং পানিশূন্যতা বাড়ায়
১৪লেবু ও টমেটোউচ্চ অ্যাসিডিক উপাদান অন্ত্রে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে
১৫ঝাল চাটনিঝাল খাবার অন্ত্রে সমস্যা ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে
১৬পালংশাকগ্যাস তৈরি করতে পারে এবং অন্ত্রের সমস্যা বাড়ায়
১৭রুই ও কাতলা মাছঅনেকের জন্য ভারী হতে পারে এবং গ্যাস সৃষ্টি করতে পারে
১৮দুধজাত খাবার (যেমন ঘি, মাখন)হজমে কঠিন এবং পেটের সমস্যা বাড়াতে পারে
১৯পিয়াজঅন্ত্রের অস্বস্তি এবং গ্যাস সৃষ্টি করে
২০কাঁচা মরিচঝাল অনুভূতি বাড়িয়ে পাকস্থলী ও অন্ত্রের সমস্যা বাড়ায়

আরো পড়ুন:

উপসংহার

আমাশয় রোগীদের জন্য সঠিক খাদ্য নির্বাচন করা অত্যন্ত জরুরি। উপযুক্ত খাবার খেলে রোগটির প্রতিক্রিয়া কমানো সম্ভব এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তবে, যদি আপনার অবস্থার অবনতি হয়, তাহলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। 

খাবার নির্বাচনের পাশাপাশি বিশ্রাম, স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং মানসিক চাপ কমানোর দিকে বিশেষ নজর দিন। স্বাস্থ্যকর খাবার এবং জীবনযাপন অবলম্বন করে আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকা সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর

আমাশয়ের লক্ষণ কি কি?

আমাশয়ের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে পেটে ব্যথা, ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, মলদ্বারের ব্যথা, মলের সঙ্গে রক্ত বা শ্লেষ্মা বের হওয়া, বমি বমি ভাব ও শরীরে পানিশূন্যতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীরা দুর্বল বোধ করে এবং খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়।

আমাশয় হলে পায়খানা কেমন হয়?

আমাশয় হলে পায়খানা সাধারণত ঘন ঘন এবং পাতলা হয়। মলের সঙ্গে শ্লেষ্মা বা রক্ত থাকতে পারে। পায়খানার রঙ কিছুটা গাঢ় বা লালচে হয়ে থাকে এবং এটি নরম ও পানির মতো হতে পারে, যা শরীরের পানিশূন্যতার দিকে ইঙ্গিত করে।

আমাশয় কি ছোঁয়াচে রোগ?

হ্যাঁ, আমাশয় একটি ছোঁয়াচে রোগ। এটি সাধারণত দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। যারা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে না, তাদের মধ্যেও এটি সহজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং নিরাপদ পানীয় ও খাদ্য গ্রহণ করা জরুরি।

কি খেলে আমাশয় ভালো হবে?

আমাশয় ভালো করতে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত, যেমন সাদা ভাত, মুড়ি, সেদ্ধ আলু, পাতলা খিচুড়ি, সেদ্ধ সবজি ও স্যুপ। ডাবের পানি বা ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় পান করা শরীরকে হাইড্রেট রাখে এবং দ্রুত শক্তি যোগায়। আমাশয়ে আক্রান্তদের হালকা এবং সহজে হজম হয় এমন খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে অন্ত্রের উপর বাড়তি চাপ না পড়ে।

আমাশয় হলে কলা খেলে কি ক্ষতি হয়?

আমাশয়ে কলা খাওয়া সাধারণত ক্ষতিকর নয়; বরং এটি উপকারী হতে পারে। কলা সহজপাচ্য, শরীরে দ্রুত শক্তি যোগায় এবং অন্ত্রকে প্রশমিত করে। এটি শরীরে পটাসিয়াম সরবরাহ করে, যা আমাশয়ের কারণে শরীরে ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি পূরণে সহায়ক।

আমাশয় হলে দুধ খাওয়া যাবে কি?

আমাশয়ে সরাসরি দুধ খাওয়া এড়ানো উচিত, কারণ দুধ হজমে কঠিন এবং গ্যাস ও ডায়রিয়া বাড়িয়ে তুলতে পারে। তবে, যদি প্রয়োজন হয়, সামান্য দই বা দুধ থেকে তৈরি হালকা খাবার খাওয়া যেতে পারে, যা অন্ত্রে আরাম দেয় এবং প্রোবায়োটিক সরবরাহ করে।

আমাশয় হলে কি খাওয়া যাবেনা?

আমাশয় রোগীর খাবার তালিকায় ভাজাপোড়া, তেল ও মসলাযুক্ত খাবার, মিষ্টি, আচার, কাঁচা সবজি এবং কোল্ড ড্রিংকস ইত্যাদি রাখা উচিত নয়। এগুলো হজমে কঠিন এবং অন্ত্রের জ্বালাপোড়া ও গ্যাস বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা রোগের লক্ষণগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

কি পাতা খেলে আমাশয় ভালো হয়?

আমাশয় ভালো করতে গুঁড়ো করা বা সিদ্ধ করা তুলসী পাতা বা নিমপাতা খাওয়া যেতে পারে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ, যা অন্ত্রের সংক্রমণ কমাতে সহায়ক।

আমাশয় হলে কি কলা খাওয়া যাবে?

হ্যাঁ, আমাশয় হলে কলা খাওয়া নিরাপদ এবং বেশ উপকারী। এটি সহজে হজম হয়, অন্ত্রকে প্রশমিত করে এবং শরীরে প্রয়োজনীয় পটাসিয়াম সরবরাহ করে। কলা শরীরে দ্রুত শক্তি যোগায় এবং পানিশূন্যতা রোধে সহায়ক।

আমাশয় হলে কি মাছ খাওয়া যায়?

আমাশয় হলে হালকা সেদ্ধ করা মাছ যেমন- রুই, কাতলা, পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, মাগুর, শিং, পাবদা, ইলিশ, বোয়াল, এবং কৈ মাছ খাওয়া যেতে পারে, তবে ভাজা বা মশলাদার মাছ এড়ানো ভালো।

Scroll to Top