আমাদের শরীরে রক্তের ঘাটতি নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। রক্তের অভাবে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে গুরুতর শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শরীরে রক্তের মাত্রা সঠিক রাখতে সুষম খাদ্য এবং জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আনা দরকার।
এই আর্টিকেলে আমরা জানতে পারবো, শরীরে রক্ত বৃদ্ধির উপায়, শরীরে রক্ত কমে গেলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে এবং এর লক্ষণগুলো কী কী।
শরীরে রক্ত কমে গেলে কি কি সমস্যা হয়?
শরীরে রক্ত কমে গেলে (অ্যানিমিয়া) নানান ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু সমস্যা হলো:
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শরীরে রক্তের পরিমাণ কমে গেলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, এবং ঘন ঘন বিশ্রামের প্রয়োজন হয়।
- মাথা ঘোরা ও শ্বাসকষ্ট: রক্ত কমে গেলে অনেকেই প্রায়শই মাথা ঘোরা অনুভব করেন। শারীরিক পরিশ্রমে শ্বাসকষ্টও হতে পারে।
- ত্বকের ফ্যাকাশে ভাব: শরীরে রক্তের অভাবে ত্বক ফ্যাকাশে ও রঙহীন হয়ে পড়তে পারে। ঠোঁট, নখের পাশেও এই ফ্যাকাশে ভাব দেখা দেয়।
- হার্টবিট বেড়ে যাওয়া: শরীরে রক্ত কম হলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। হৃদপিণ্ডের কাজ করতে কষ্ট হয়, কারণ এটি শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলোতে পর্যাপ্ত রক্ত সরবরাহ করতে হিমশিম খায়।
- হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া: রক্ত কমে গেলে হৃদযন্ত্রকে আরও বেশি কাজ করতে হয়, যার ফলে হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে যায় এবং কখনও কখনও বুক ধড়ফড় করতে পারে।
শরীরে রক্ত বৃদ্ধির উপায়: সহজ কিন্তু কার্যকর

1. আয়রন-সমৃদ্ধ খাবার
প্রচুর আইরন রয়েছে এরকম খাবার শরীরে রক্ত তৈরি করতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। রক্তের হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে আয়রন অনেক বেশি প্রয়োজন। আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেলে শরীরে রক্ত উৎপাদন স্বাভাবিক হয় এবং রক্তশূন্যতার ঝুঁকি কমে।
রক্তশূন্যতা দূর করতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার এর কোন বিকল্প নাই। সুতরাং আপনাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। নিচে আয়রন সমৃদ্ধ খাবার নিয়ে আলোচনা করা হলো:
কোন কোন খাবারে আয়রন বেশি পাওয়া যায়?
- লাল মাংস: গরু বা ছাগলের মাংসে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। তবে অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, তাই পরিমিতভাবে খেতে হবে।
- সবুজ শাকসবজি: বিশেষ করে পালং শাক, মেথি শাক এবং ব্রকলি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। প্রতিদিন যে কোন একটি শাক বা সবজি খাবার তালিকায় যুক্ত করুন।
- শুকনো ফল ও বাদাম: কিশমিশ, বাদাম, কাজু, এবং আখরোট রক্তবর্ধক হিসেবে কার্যকর। সুতরাং এগুলো নিয়মিত খান।
- ডিম: ডিমের কুসুমে প্রচুর পরিমাণ আয়রন রয়েছে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ডিম অন্তর্ভুক্ত করুন।
- ডাল: বিভিন্ন ধরনের ডাল যেমন মুগ, মসুর, ছোলা আয়রনের ভালো উৎস। রাতে অথবা সকালের খাবারের ডাল যুক্ত করুন।

মেয়েদের দ্রুত ওজন কমানোর উপায়: ৭টি সঠিক উপায়
২. ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার খান
ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করে। তাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি খেতে হবে। ভিটামিন সি খাবার যেমন:
- কমলা, লেবু, মাল্টা
- স্ট্রবেরি, ডালিম (আনার)
- আমড়া, কাঁঠাল
- আমলকি, খেজুর

৩. ফোলেট ও ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার
ফোলেট এবং ভিটামিন বি১২ শরীরের রক্তে লোহিত কণিকা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই পুষ্টিগুলো রক্তের ঘাটতি পূরণে খুবই জরুরি। ফোলেটের ভালো উৎস হলো:
- মটরশুটি, লিমা বিনস
- শাকসবজি (পালং শাক, মেথি শাক)
- দানাশস্য (যেমন: ব্রাউন রাইস, ওটস)
- লাল শাক (Red spinach): লাল শাক একটি জনপ্রিয় শাক, যা ফোলেটের ভালো উৎস।
- মুগ ডাল (Green gram): মুগ ডাল ভিজিয়ে অথবা রান্না করে খেলে ফোলেট পাওয়া যায়।
- ছোলা (Chickpeas): ছোলা বা বুট ফোলেটের একটি চমৎকার উৎস এবং সহজলভ্যও।
আর ভিটামিন বি১২ এর জন্য খান:
- ডিম
- মাছ (যেমন: সামুদ্রিক মাছ)
- মাংস
- গরুর কলিজা
- দুধ, দই, ঘি

পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের গুরুত্ব
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর তার নিজস্ব সুরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখতে পারে না। রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং রক্ত উৎপাদনের প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক রাখে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য ঘুমকে গুরুত্ব দিতে হবে।
যখন আপনি ঘুমাবেন তখন আপনার রক্ত তৈরিতে শরীর কাজ করবি সুতরাং রক্ত তৈরিতে পর্যাপ্ত বিশ্রাম অর্থাৎ ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই অন্তত রাতে আট ঘণ্টা ঘুমান

উপসংহার
শরীরে রক্তের ঘাটতি পূরণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধুমাত্র শারীরিক সমস্যা থেকে রক্ষা করে না, বরং মানসিক স্বাস্থ্যও ভালো রাখে। এই জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম এবং শারীরিক পরিশ্রম শরীরে রক্ত বৃদ্ধির উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি শরীরে রক্ত কম হওয়ার লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
আশা করি আর্টিকেলটি আপনার কাজে আসবে। সুতরাং ভালো লাগলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানান। আর এরকম রেগুলার টিপস পেতে আমাদের সাথেই থাকুন
সাধারণ প্রশ্নাবলী (FAQ)
-
শরীরে রক্ত কমে গেলে কি কি সমস্যা হয়?
শরীরে রক্ত কমে গেলে রক্তাল্পতা (অ্যানিমিয়া) দেখা দেয়, যার ফলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়:
1. শারীরিক দুর্বলতা ও ক্লান্তি
2. মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা
3. শ্বাসকষ্ট
4. ত্বক ও নখ ফ্যাকাশে হওয়া
5. বুক ধড়ফড় বা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া
6. মনোযোগ কমে যাওয়া এবং মানসিক অবসাদ -
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির খাবার কি কি?
রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধিতে সহায়ক কিছু খাবার:
1. আদা: রক্ত প্রবাহ বাড়াতে সাহায্য করে
2. রসুন: রক্তচাপ কমাতে ও রক্ত প্রবাহ বাড়াতে উপকারী
3. বিটরুট: নাইট্রেট সমৃদ্ধ, যা রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়
4. মাছ: ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রক্ত প্রবাহ উন্নত করে
5. কায়েন পিপার: রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে সহায়ক -
কি কি খাবার খেলে হিমোগ্লোবিন বাড়ে?
হিমোগ্লোবিন বাড়াতে উপকারী খাবার:
1. লাল মাংস (গরু বা খাসির মাংস): উচ্চ পরিমাণে আয়রন রয়েছে
2. ডিম: আয়রন ও ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ
3. সবুজ শাকসবজি (পালং শাক, কচু শাক): আয়রন ও ফলেট সমৃদ্ধ
4. লিভার: আয়রন ও ভিটামিন সি-এর ভালো উৎস
5. আপেল, ডালিম: হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধিতে সহায়ক ফল -
দুধ খেলে কি রক্ত বাড়ে?
দুধে সরাসরি রক্ত বাড়ে না, তবে এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন এবং ভিটামিন বি১২ থাকে যা শরীরকে শক্তিশালী রাখে এবং রক্ত তৈরির জন্য সহায়ক হতে পারে। তবে, আয়রন বাড়াতে দুধ এককভাবে কার্যকর নয়।
-
কি কি খাবার খেলে শরীরে রক্ত বৃদ্ধি পায়?
রক্ত বৃদ্ধি করতে সহায়ক কিছু খাবার: লাল মাংস, ডাল ও লেবু,মাছ, সবুজ শাকসবজি, ডিম
-
কি কি খাবার খেলে রক্ত শূন্যতা দূর হয়?
রক্তশূন্যতা বা রক্তের ঘাটতি পূরণ করতে সহায়ক কিছু খাবার:
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার: লাল মাংস, পালং শাক, লেবু
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার: কমলালেবু, ব্রকলি
ফলেট সমৃদ্ধ খাবার: মটরশুঁটি, ডাল
ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার: ডিম, দুধ, পনির -
কি খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়?
রক্ত পরিষ্কার রাখতে সহায়ক কিছু খাবার: লেবু ও লেবুর রস, আদা ও রসুন, শসা ও গাজর, পালং শাক ও ব্রকলি, সবুজ চা
-
কি কি খাবার খেলে রক্ত ভালো হয়?
রক্ত ভালো রাখতে সহায়ক কিছু খাবার: লাল মাংস, সবুজ শাকসবজি, বিটরুট, ডালিম ও আপেল, আঙুর ও বেরি জাতীয় ফল
-
রক্তাল্পতার জন্য কোন ফল?
রক্তাল্পতা দূর করতে হঠাৎ রক্তের ঘাটতি পূরণ সহায়ক ফল:
ডালিম: আয়রন সমৃদ্ধ
আপেল: হিমোগ্লোবিন বৃদ্ধি করে
কমলালেবু: ভিটামিন সি এর উৎস, যা আয়রন শোষণ বাড়ায়
আঙুর: রক্ত সঞ্চালন উন্নত করে
কলা: আয়রন ও ফলেটের উৎস