গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার কারণ: লক্ষণ ও জরুরি সতর্কতা

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার লক্ষণ
চিত্র: গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার কারণ ও লক্ষণ

বাচ্চা পৃথিবীতে আগমনের আগে অর্থাৎ ৩৮-৪১ সপ্তাহ, তখন সে হাত পা নাডাতে থাকে। সেই হাত পা নাড়ানোর একপর্যায়ে থলেটি ছিড়ে যায়।,যার জন্য মায়ের যোনিপথ দিয়ে পানি আসতে থাকে।যেটাকে আমরা গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙা বলে থাকি। আর এই পানি ভাঙা শুরু হলেই বুঝতে হবে প্রসবের আর বেশি দেরি নেই।

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার কারণ, লক্ষণ কিভাবে বুঝবেন? কিভাবে বুঝবেন পানি ভাঙা শুরু হয়েছে কি না? আপনার যদি গর্ভাবস্থার তৃতীয় ত্রৈমাসিক চলে থাকে তবে সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় হলো আপনার সন্তান কবে এই পৃথিবীর আলো দেখবে? নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে

গর্ভবতী মহিলার পানি ভাঙে কেন?

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙা সাধারণত শিশুর জন্মের প্রস্তুতি। সাধারণত, এটি গর্ভাবস্থার ৩৭ সপ্তাহের পরে স্বাভাবিক প্রসবের সময় হয়। তবে, কিছু ক্ষেত্রে এটি আগে ঘটে যেতে পারে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

গর্ভবতী মহিলার পানি ভাঙার কারণ:

প্রাকৃতিক প্রসবের শুরু:

গর্ভধারণের শেষ পর্যায়ে শরীর প্রসবের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। তখন জরায়ুর সংকোচন (contraction) বৃদ্ধি পায়, যা অ্যামনিয়োটিক থলিকে ফাটিয়ে দিতে পারে।

অতিরিক্ত চাপ বা প্রসারিত জরায়ু:

যদি গর্ভফুল (placenta) বড় হয়ে যায় বা গর্ভে বেশি পরিমাণ অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড থাকে, তবে তা অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে, যা পানি ভাঙার কারণ হতে পারে।

শারীরিক চাপ বা আঘাত:

অতিরিক্ত পরিশ্রম, হঠাৎ পড়ে যাওয়া, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো বাহ্যিক চাপ অ্যামনিয়োটিক থলিকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং পানি ফাটার কারণ হতে পারে।

ইনফেকশন বা সংক্রমণ:

জরায়ু বা অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইডে কোনো সংক্রমণ হলে থলিটি দুর্বল হয়ে ফেটে যেতে পারে। এটি সাধারণত অপরিকল্পিত বা আগেভাগে পানি ভেঙে যাওয়ার (Premature Rupture of Membranes – PROM) একটি কারণ।

যমজ বা একাধিক গর্ভধারণ:

যমজ বা একাধিক সন্তান ধারণ করলে জরায়ুতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি চাপ পড়ে, ফলে পানি আগেভাগে ভেঙে যেতে পারে।

আগের গর্ভধারণের ইতিহাস:

পূর্বে যদি কোনো মহিলার আগেভাগে পানি ভেঙে গিয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী গর্ভধারণেও একই ঝুঁকি থাকতে পারে।

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার লক্ষণ

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার লক্ষণ হলো এমন একটি গর্ভকালীন ঘটনা যা গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে স্বাভাবিক প্রসবের প্রস্তুতি নির্দেশ করে। তবে, এটি নির্ধারিত সময়ের আগেও হতে পারে, যা কখনো কখনো বিপজ্জনক। গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার লক্ষণগুলো নিম্নরূপ:

  • হঠাৎ করে তরল নির্গমন: যোনিপথ দিয়ে হঠাৎ বড় পরিমাণ তরল বের হয়ে যেতে পারে। এটি সাধারণত অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের কারণে ঘটে, এবং এর রং স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ হতে পারে। তরল নির্গমন ধীরে ধীরে ফোঁটা ফোঁটা আকারেও হতে পারে [reference tooltip=”American College of Obstetricians and Gynecologists. “Premature Rupture of Membranes.” ACOG Practice Bulletin, 2020.”]।
  • তরলের গন্ধ: অ্যামনিওটিক ফ্লুইডের গন্ধ সাধারণত মিষ্টি ধরনের হয়। যদি গন্ধ দুর্গন্ধযুক্ত হয়, তবে ইনফেকশনের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
  • ক্ষুদ্র সংকোচন বা চাপ অনুভব: পানি ভাঙার আগে বা পরে, পেটের নিচে হালকা চাপ বা সংকোচন অনুভূত হতে পারে। এটি জরায়ুর সংকোচন বা প্রসব প্রক্রিয়ার শুরুর লক্ষণ হতে পারে [reference tooltip=”Royal College of Obstetricians and Gynaecologists. “Care of Women Presenting with Suspected Preterm Prelabour Rupture of Membranes.” Green-top Guideline No. 73, 2021.”]।
  • পেটের নিচের অংশে হালকা ব্যথা: পানি ভাঙার পর জরায়ুর সংকোচনের কারণে ব্যথা শুরু হতে পারে। এটি ধীরে ধীরে তীব্র হতে পারে।
  • তরলের রঙ পরিবর্তন: যদি অ্যামনিওটিক ফ্লুইডে সবুজ বা বাদামি আভা দেখা যায়, তবে এটি মেকোনিয়াম (শিশুর প্রথম মল) মিশ্রিত হতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন নির্দেশ করে [reference tooltip=”Spong, C. Y., et al. “Premature Rupture of Membranes: Risks and Management.” New England Journal of Medicine, vol. 355, no. 8, 2011, pp. 234-240.”]।

আরো পড়ুন:

পানি ভাঙার কতক্ষণ পর প্রসব হয়

গর্ভবতী নারীর পানি ভাঙার পর সাধারণত কতক্ষণে প্রসব শুরু হয় তা নির্ভর করে গর্ভাবস্থার সময়কাল, মায়ের শারীরিক অবস্থা, এবং প্রসবের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ওপর। স্বাভাবিক গর্ভধারণের ক্ষেত্রে (৩৭ সপ্তাহ বা তার বেশি) পানি ভাঙার ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রসব শুরু হওয়া স্বাভাবিক। তবে, যদি যদি স্বাভাবিকভাবে প্রসব শুরু না হয়, তাহলে চিকিৎসকরা প্রসবের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করতে কিছু ওষুধ বা বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন [reference tooltip=”American College of Obstetricians and Gynecologists. “Premature Rupture of Membranes.” ACOG Practice Bulletin, 2020.”]।

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার পর কি করবেন?

  • পানি ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়া জরুরি।
  • প্রসবের সময়কাল নির্ধারণের জন্য চিকিৎসক প্রসবপূর্ব পরীক্ষা, জরায়ুর সংকোচন, এবং শিশুর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করেন।

গবেষণা অনুযায়ী, পানি ভাঙার পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় অতিবাহিত হলে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। এই অবস্থায় প্রসব ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় [reference tooltip=”Royal College of Obstetricians and Gynaecologists. “Care of Women Presenting with Suspected Preterm Prelabour Rupture of Membranes.” Green-top Guideline No. 73, 2021.”]।

হাসপাতালের জন্য প্রস্তুতি নিন

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙার লক্ষণ
একজন মা সদ্য জন্ম নেয়া শিশু দেখে খুশি

যদি আপনার পানি ভেঙে যায়, তাহলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিন। কিছু জরুরি জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিন: কারণ শীঘ্রই  আপনাদের সন্তান পৃথিবীতে আসতে চলেছেন। সুতরাং মেডিকেলে যাওয়ার জন্য, যা যা জিনিসপত্র নিবেন:

  • মেডিকেল রিপোর্ট: আপনার গর্ভাবস্থার সব রিপোর্ট একসঙ্গে রাখুন।
  • ওষুধপত্র: যেসব ওষুধ নিয়মিত খেতে হয় সেগুলো সঙ্গে নিন।
  • বাচ্চার জন্য কাপড়: নতুন বাচ্চার জন্য নরম কাপড় সঙ্গে নিয়ে নিন
  • অন্যান্য সামগ্রী: অবশ্যই বালিশ কাথা কাপড় নিতে ভুলবেন না

উপসংহার

গর্ভাবস্থায় পানি ভাঙা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। এই সময় ধৈর্য ধরে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশের মায়েদের জন্য পানি ভাঙার লক্ষণ এবং কীভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে তা নিয়ে এই আলোচনা আশা করি আপনাদের উপকারে আসবে। 

সর্বশেষ কথা একটায় পানি ভাঙার ২৪ঘন্টার ভেতরেই আপনার প্রসব ব্যাথা শুরু হবে। আর যদি না  হয়  তাহলে বুঝতে হবে আপনার গর্ভাবস্থায় কোন সমস্যা আছে। আর পানি ভাঙা শুরু হয়েছে কিনা তা বুঝার লক্ষন তো আমরা শুরুতেই বলে দিয়েছি। সুতরাং সবসময় ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন এবং পরিবারের সাহায্য নিন।

Scroll to Top