ঘুম না আসার কারণ: কেন আপনি রাতে ভালো ঘুমাতে পারছেন না?

ঘুম একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া যা আমাদের শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। সুস্থ জীবনের জন্য যতটা দরকার স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানি, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ঘুম। কিন্তু অনেক সময় বিভিন্ন কারণে ঘুম ঠিকমতো হয় না। ঘুমের অভাব শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর প্রভাব ফেলে, যার ফলে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হয়। 

এই আর্টিকেলে, আমরা বিশদভাবে আলোচনা করব কেন ঘুম আসে না, কোন বয়সে কতটা ঘুম প্রয়োজন?, রাতে ঘুম না হলে করণীয় এবং দ্রুত ঘুমানোর সহজ উপায়।

কোন বয়সে কতটা ঘুম প্রয়োজন?

প্রত্যেকের ঘুমের প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে এবং এটি সাধারণত বয়স এবং শারীরিক কার্যকলাপের ওপর নির্ভর করে। ঘুমের অভাব আমাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। নিচে বয়সভিত্তিক ঘুমের প্রয়োজনের তালিকা দেওয়া হলো:

  • নবজাতক (০-৩ মাস): ১৪-১৭ ঘন্টা
  • শিশু (৪-১১ মাস): ১২-১৫ ঘন্টা
  • ছোট শিশু (১-২ বছর): ১১-১৪ ঘন্টা
  • প্রী-স্কুল শিশু (৩-৫ বছর): ১০-১৩ ঘন্টা
  • প্রাইমারি স্কুল শিশু (৬-১৩ বছর): ৯-১১ ঘন্টা
  • কিশোর (১৪-১৭ বছর): ৮-১০ ঘন্টা
  • প্রাপ্তবয়স্ক (১৮-৬৪ বছর): ৭-৯ ঘন্টা
  • বয়স্ক (৬৫+ বছর): ৭-৮ ঘন্টা

ঘুমের পরিমাণ সঠিক হলে শরীর ও মনের কর্মক্ষমতা ভালো থাকে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, এবং দৈনন্দিন কাজগুলো আরও সহজভাবে সম্পন্ন করা যায়।

ঘুম না আসার কারণ কি?

ঘুম না আসার কারণ
ঘুম না আসার কারণ

ঘুম না আসার সমস্যার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা। আপনি সবসময় একটা কথা চিন্তা করুন: যা খুশি তা হবে, যখন খুশি তখন হবে, যেভাবে খুশি  সেভাবে হবে। সৃষ্টিকর্তা আমার সাথে আছেন।

 এছাড় কিছু সাধারণ ঘুম না আসার কারণ নিম্নরূপ:

  1. বিরক্তিকর চিন্তা এবং মানসিক চাপ: অতীতের কোনও খারাপ ঘটনা, ভবিষ্যতের উদ্বেগ বা অনিশ্চয়তা নিয়ে চিন্তা করা মনকে শান্ত করতে দেয় না এবং ঘুমানোর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে।
  2. স্ট্রেস এবং উদ্বেগ: আধুনিক জীবনে স্ট্রেস এবং উদ্বেগ ঘুম না আসার কারণ হয়ে উঠেছে। অফিসের কাজের চাপ, ব্যক্তিগত সমস্যা, বা অন্য যেকোনো মানসিক চাপ মস্তিষ্ককে সারাক্ষণ চিন্তায় মগ্ন রাখে। এর ফলে ঘুমানোর সময় মস্তিষ্ক শান্ত থাকতে পারে না এবং সহজে ঘুম আসে না।
  3. ঘুমের সময়সূচি: অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি ঘুম না আসার কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম। যদি আপনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে না যান, তাহলে আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বিঘ্নিত হয়। এই ঘড়ি বা সার্কেডিয়ান রিদম আমাদের শরীরকে জানায় কখন ঘুমানোর সময় এবং কখন জেগে থাকার সময়। এই সময়সূচি বিঘ্নিত হলে ঘুমের সমস্যা তৈরি হতে পারে।
  4. ক্যাফেইন বা নিকোটিন: চা, কফি, বা সিগারেটের মধ্যে ক্যাফেইন এবং নিকোটিন থাকে যা আমাদের মস্তিষ্ককে সতর্ক রাখে। ঘুমানোর আগে এগুলো গ্রহণ করলে আমাদের মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে ঘুমাতে দেরি হয়।
  5. ইলেকট্রনিক ডিভাইস: মোবাইল, ট্যাবলেট, কম্পিউটার, এবং টিভির নীল আলো আমাদের মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে। মেলাটোনিন আমাদের শরীরে ঘুমের জন্য দায়ী হরমোন যা রাতে ঘুমানোর সংকেত দেয়। তাই ঘুমানোর আগে এই ডিভাইসগুলোর ব্যবহার সীমিত করা উচিত।
  6. বাইরের শব্দ বা আলো: ঘুমানোর সময় বেশি আলো বা অতিরিক্ত শব্দ থাকলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। তাছাড়া, যদি ঘরের তাপমাত্রা খুব গরম বা ঠান্ডা হয়, তাও ঘুমের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
  7. শরীরিক অসুস্থতা বা ব্যথা: কখনও কখনও শারীরিক ব্যথা বা অসুস্থতা যেমন পেটের গ্যাস, মাথাব্যথা, কিংবা শ্বাসকষ্ট ঘুমের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়াও, কিছু দীর্ঘস্থায়ী রোগ যেমন আর্থাইটিস বা হৃদরোগ থাকলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে।

রাতে ঘুম না হলে করণীয় কি?

রাতে ঘুম না এলে বা ঘুমের মধ্যে জেগে গেলে কিছু করণীয় পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে যা ঘুমের মান উন্নত করতে সাহায্য করবে:

  1. শরীরিক ও মানসিক শিথিলকরণ: ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন এবং মনকে শিথিল করার চেষ্টা করুন। ধ্যান বা ইয়োগা প্র্যাকটিস করা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।
  2. হালকা বই পড়ুন: কোন রোমাঞ্চকর বা উত্তেজনামূলক বই নয়, বরং হালকা ও সাধারণ বই বা ম্যাগাজিন পড়ুন যা আপনার মনকে শান্ত করবে এবং দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করবে।
  3. ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: ঘুমানোর অন্তত ৪-৬ ঘণ্টা আগে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় (চা, কফি) এবং অ্যালকোহল পান করা এড়িয়ে চলুন। এগুলো আপনার ঘুমের চক্রকে ব্যাহত করতে পারে।
  4. ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ রাখুন: ঘুমানোর অন্তত ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট, কম্পিউটার এবং টিভি বন্ধ রাখুন। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নীল আলো মেলাটোনিন উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করে যা ঘুমের প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করে।
  5. হালকা গরম দুধ পান করুন: রাতে ঘুমানোর আগে হালকা গরম দুধ পান করলে ঘুমের সমস্যা কমে। দুধে উপস্থিত ট্রিপটোফান হরমোন ঘুমকে সহায়তা করে।
  6. ঘুমানোর জন্য একটি শান্ত পরিবেশ তৈরি করুন: ঘরের আলো কমিয়ে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে একটি ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করুন। ঘরের তাপমাত্রা বেশি গরম বা বেশি ঠান্ডা হওয়া উচিত নয়।

দ্রুত ঘুম আসার উপায়

দ্রুত ঘুম আসার উপায়
দ্রুত ঘুম আসার উপায়

দ্রুত ঘুমানোর জন্য কিছু কার্যকর উপায় নিম্নে উল্লেখ করা হলো:

  1. ৪-৭-৮ শ্বাস প্রক্রিয়া: এই প্রক্রিয়ায়, প্রথমে নাক দিয়ে ৪ সেকেন্ড শ্বাস নিন, ৭ সেকেন্ড ধরে রাখুন এবং মুখ দিয়ে ৮ সেকেন্ড শ্বাস ছাড়ুন। এই পদ্ধতি শরীরকে শান্ত করে এবং ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
  2. পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথা পর্যন্ত শিথিলকরণ: শোয়ার সময় পায়ের আঙ্গুল থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত শরীরের প্রতিটি অংশ ধীরে ধীরে শিথিল করার চেষ্টা করুন। এই পদ্ধতি আপনার শরীরকে সম্পূর্ণরূপে বিশ্রামে রাখবে।
  3. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করুন, তবে ঘুমানোর সময়ের কাছাকাছি ব্যায়াম করা উচিত নয়। এটি শরীরকে ক্লান্ত করবে এবং সহজে ঘুম আসবে।
  4. মনকে ধ্যানের মাধ্যমে শিথিল করুন: ধ্যান এবং শ্বাস প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মনের মধ্যে চিন্তা দূর করুন এবং ঘুমানোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করুন।
  5. সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখুন: ঘরের তাপমাত্রা একটু ঠান্ডা রাখলে শরীরের তাপমাত্রা কমে এবং সহজে ঘুম আসে। ঘুমানোর জন্য আদর্শ তাপমাত্রা প্রায় ৬৫°F (১৮°C) হওয়া উচিত।

উপসংহার

ঘুম আমাদের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমাদের শরীরের পুনর্গঠন এবং মনের শান্তির জন্য অপরিহার্য। ঘুমের সমস্যা হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রভাব পড়ে এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 

উপরের পরামর্শগুলো অনুসরণ করলে ঘুমের মান উন্নত করা যায় এবং শরীর ও মনকে সুস্থ রাখা যায়। সুতরাং, স্বাস্থ্যকর ঘুম নিশ্চিত করে নিজের জীবনের মান বাড়ান এবং প্রতিদিন আরও সক্রিয় ও উৎফুল্ল থাকুন।

Scroll to Top