ডায়রিয়া হলে করণীয়: কি খাবেন এবং কি করবেন?

ডায়রিয়া হলো একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রায় সকল বয়সের মানুষকেই কোনো না কোনো সময়ে ভোগায়। এটি মূলত একটি পেটের সমস্যা, যার ফলে বারবার পায়খানা পাতলা হয়ে আসে। ডায়রিয়ার সময় শরীর থেকে প্রচুর পানি ও ইলেকট্রোলাইট বের হয়ে যায়, যার ফলে ডিহাইড্রেশনের (পানিশূন্যতা) ঝুঁকি তৈরি হয়। যদিও ডায়রিয়া সাধারণত সাময়িক এবং স্বল্পস্থায়ী হয়, তবে কখনো কখনো এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে শিশু এবং বৃদ্ধদের জন্য ডায়রিয়া হতে পারে খুবই বিপজ্জনক, কারণ তাদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা ঘটে।

ডায়রিয়ার কারণ বিভিন্ন হতে পারে, যেমন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া, বা কোনও সংক্রমণ। কিছু ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যারও লক্ষণ হতে পারে। তাই, ডায়রিয়া হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও তরল গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ডায়রিয়া হলে করণীয় কি?

ডায়রিয়া হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। মূলত ডায়রিয়া একটি সাধারণ সমস্যা, তবে এটি খুবই কষ্টদায়ক হতে পারে এবং ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি তৈরি করে। ডায়রিয়া হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা উচিত:

  1. প্রচুর পানি পান করুন: ডায়রিয়া শরীর থেকে প্রচুর তরল বের করে দেয়, যা ডিহাইড্রেশনের কারণ হতে পারে। সেক্ষেত্রে পানি, ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন), ডাবের পানি বা লবণ-চিনির পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  2. ওরস্যালাইন: প্রতিবার পাতলা পায়খানা হলে ১ গ্লাস (প্রায় ২৫০ মি.লি.) ওরস্যালাইন পান করতে হবে। শিশুদের জন্য পরিমাণটা কমানো যেতে পারে, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  3. আরাম করুন: ডায়রিয়া হলে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়, তাই বেশি বিশ্রাম নিন এবং শক্তি সঞ্চয় করুন।
  4. হালকা খাবার খান: খুব ভারী বা তেল-মশলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। হালকা খাবার যেমন খিচুড়ি, সিদ্ধ আলু, দই ইত্যাদি খাওয়া উচিত।
  5. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: যদি ডায়রিয়া দুই দিনের বেশি স্থায়ী হয় বা তীব্র পানি শূন্যতা দেখা দেয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডায়রিয়া হলে কি খাওয়া উচিত?

ডায়রিয়ার সময় খাদ্যাভ্যাসে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। সঠিক খাদ্য গ্রহণে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব। নিচে কিছু খাবারের পরামর্শ দেওয়া হলো:

  1. ওআরএস ও পানীয়: ডায়রিয়া হলে শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করতে ওআরএস পান করা সবচেয়ে কার্যকর। এছাড়া ডাবের পানি ও লবণ-চিনির মিশ্রণও পান করা যেতে পারে।
  2. দই: প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ দই খাওয়া ডায়রিয়ার জন্য উপকারী। এটি পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করে এবং পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা কমায়।
  3. কলা: কলায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে, যা শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  4. সিদ্ধ আলু: এটি হালকা ও সহজ পাচ্য খাবার। আলুতে থাকা শর্করা দ্রুত শক্তি জোগায় এবং পেটকে শান্ত রাখে।
  5. খিচুড়ি: হালকা এবং পুষ্টিকর খিচুড়ি ডায়রিয়া রোগীর জন্য আদর্শ খাবার, যা সহজে হজম হয়।

ডায়রিয়ার চিকিৎসা কি?

ডায়রিয়ার চিকিৎসা মূলত এর কারণের ওপর নির্ভর করে। ডায়রিয়ার সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতি:

  1. ওআরএস: ডায়রিয়ার চিকিৎসায় ওআরএস সবচেয়ে কার্যকর। এটি শরীরের পানি এবং লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে।
  2. ওরস্যালাইন (ORS) খাওয়া: ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে তরল, লবণ এবং ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণ করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হলো ওরস্যালাইন। ওরস্যালাইন মূলত পানি, লবণ ও চিনির মিশ্রণ, যা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এটি বাড়িতেও সহজেই তৈরি করা যায় এবং বাজারে প্রস্তুত ওরস্যালাইন প্যাকেট আকারেও পাওয়া যায়।
  3. প্রোবায়োটিকস: প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট বা প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার, যেমন দই, পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায় এবং ডায়রিয়ার উপশমে সহায়তা করে।
  4. অ্যান্টিবায়োটিক: যদি ডায়রিয়ার কারণ ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হয়, তাহলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে পারেন।
  5. আইভি ফ্লুইডস: তীব্র ডিহাইড্রেশন হলে, চিকিৎসকরা শিরায় তরল সরবরাহ করতে পারেন।
  6. ডাক্তারের পরামর্শ: যদি ডায়রিয়া ৪৮ ঘন্টার বেশি স্থায়ী হয় এবং পায়খানায় রক্ত দেখা যায় বা তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়, তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
  7. শরীরে স্যালাইন দেওয়া: যখন স্যালাইন প্রয়োজন: তীব্র ডায়রিয়া হলে যদি মুখে খাওয়া ওরস্যালাইন বা তরল দ্বারা পানিশূন্যতা পূরণ সম্ভব না হয়, তখন শিরায় স্যালাইন দেওয়া হয়। বিশেষ করে যখন ডায়রিয়ার সঙ্গে অতিরিক্ত বমি থাকে বা রোগী অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।

পানির মতো পাতলা পায়খানা হলে করণীয় কি?

পানির মতো পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এটি খুবই তীব্র ডায়রিয়ার লক্ষণ হতে পারে, যা ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি বহন করে।

  1. ওআরএস পান করা: শরীরের পানিশূন্যতা পূরণ করতে অবিলম্বে ওআরএস পান করুন। এটি শরীরের তরল এবং লবণ দ্রুত পুনঃস্থাপন করে।
  2. প্রচুর পানি এবং অন্যান্য তরল পান: ডাবের পানি, লবণ-চিনির পানি বা স্যুপ পান করতে পারেন। এটি শরীরকে দ্রুত পানি শূন্যতা থেকে রক্ষা করে।
  3. হালকা খাবার: শক্ত বা ভারী খাবার এড়িয়ে চলুন। হালকা খাবার যেমন খিচুড়ি বা সেদ্ধ আলু খেতে পারেন, যা সহজে হজম হয়।
  4. চিকিৎসকের পরামর্শ: যদি পাতলা পায়খানা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তীব্র ডিহাইড্রেশন দেখা দেয় বা অন্য কোন লক্ষণ দেখা যায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

উপসংহার

ডায়রিয়া একটি সাধারণ সমস্যা হলেও, এটি সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না করলে বিপজ্জনক হতে পারে। পর্যাপ্ত তরল পান করা, হালকা খাবার খাওয়া এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডায়রিয়া থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পানীয় গ্রহণে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও, দীর্ঘ সময় ধরে ডায়রিয়া চলতে থাকলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

সাধারণ প্রশ্ন

1. ডায়রিয়া কেন হয়?

ডায়রিয়া সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবী দ্বারা সংক্রমণের কারণে হয়। এটি খাদ্যে বিষক্রিয়া, অ্যালার্জি বা কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলেও হতে পারে।

2. ডায়রিয়া কত দিন থাকে?

ডায়রিয়ার সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে এটি নির্ভর করে   কারণের ওপর। খাদ্যে বিষক্রিয়া, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের ফলে হওয়া ডায়রিয়া সাধারণত অল্প সময়ের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া (যা দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উপেক্ষা করা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় ধরে ডায়রিয়া চলতে থাকলে এটি ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা অন্য কোনো গুরুতর রোগের লক্ষণ হতে পারে।

ডায়রিয়া কি ছোঁয়াচে?

হ্যাঁ, কিছু ধরণের ডায়রিয়া ছোঁয়াচে হতে পারে, বিশেষ করে ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণজনিত ডায়রিয়া। সঠিক ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে সংক্রমণ এড়ানো যায়।

শিশুদের ডায়রিয়া হলে করণীয় কি?

শিশুর ডায়রিয়া হলে অবিলম্বে ওআরএস খাওয়ানো উচিত এবং পর্যাপ্ত তরল দেওয়া উচিত। যদি ডায়রিয়া ২৪ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডায়রিয়া হলে কী কী খাবার এড়ানো উচিত?

ডায়রিয়ার সময় দুগ্ধজাত খাবার, তেল-মশলাযুক্ত খাবার, কাঁচা ফল এবং উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার এড়ানো উচিত।


Scroll to Top