ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না: বিস্তারিত জানুন

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সঠিক খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যেটা আমরা খাই তা শরীরের শর্করার মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে পারে। কিছু সবজি আছে যেগুলোতে বেশি শর্করা থাকে, যা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না এবং কেন খাওয়া যাবে না? নিচে ব্যাখ্যা করা হয়েছে

ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না

ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না
চিত্র: ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না তার একটা ছবি

ডায়াবেটিস হলে খাওয়া দাওয়ায় সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। ডায়াবেটিস হলে অনেক খাবার খাওয়া যায় না। তবে কিছু সবজি আছে যেগুলো না খাওয়াই উত্তম। নিচে ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না অর্থাৎ ক্ষতিকর কিছু সবজি সম্পর্কে বলা হল:

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির নিচের সবজি সাধারণত রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে পারে, যেখানে মাটির উপর জন্মানো সবজি শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশি কার্যকর।

১. আলু (Potatoes)

আলুতে প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে তোলে। আলুর GI প্রায় ৮৫-৯০, যা খুবই বেশি। GI যত বেশি, খাবারটি তত দ্রুত গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়ে রক্তে মিশে যায়, ফলে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে আলু দিয়ে তৈরি খাবার তেলে ভাজাপোড়া হলে, তা অনেক বেশি ক্ষতিকর

আলু খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়বে, যা ইনসুলিন প্রতিরোধ (insulin resistance) বাড়াতে পারে। নিয়ন্ত্রণহীন শর্করার মাত্রা ডায়াবেটিস রোগীদের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন: হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এবং নার্ভের ক্ষতি।

২. মিষ্টি কুমড়া (Sweet Potatoes)

মিষ্টি কুমড়া একটি উচ্চ কার্বোহাইড্রেটযুক্ত সবজি, যা শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। যদিও এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স আলুর চেয়ে কম (৪৪-৬০)। তবুও এটি পর্যাপ্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট সরবরাহ করে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সীমিত পরিমানে খাওয়া যাবে

মিষ্টি কুমড়া খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়লেও, একাধিকবার খাওয়ার ফলে শর্করার মাত্রা ক্রমাগত উচ্চ অবস্থায় থাকতে পারে। যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সমস্যার সৃষ্টি করবে। মিষ্টি কুমড়া দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদরোগ এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।

৩. শিম (Peas)

শিমের GI প্রায় ৫৪, যা মাঝারি হলেও, এর কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেশি। শিমে উপস্থিত শর্করা দ্রুত হজম হয়ে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়। যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে পারে।

শিম বেশি পরিমাণে খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাবে। নিয়মিত শিম খাওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শর্করা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

৪. গাজর (Carrots)

কাঁচা গাজরের GI প্রায় ১৬ হলেও, রান্না করার পর এটি প্রায় ৪৭-৪৯ হয়ে যায়, যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়াতে সহায়ক। রান্নার সময় গাজরের ফাইবার ভেঙে যায়, ফলে এটি দ্রুত হজম হয় এবং শর্করায় রূপান্তরিত হয়।

রান্না করা গাজর খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়বে, যা ইনসুলিনের কার্যক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি চোখের সমস্যা, নার্ভ ড্যামেজ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৫. কুমড়া (Pumpkin)

কুমড়ার GI প্রায় ৭৫-৮০, যা খুবই বেশি। এটি শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়াতে সক্ষম।এটি সহজেই শর্করায় রূপান্তরিত হয়, ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর।

কুমড়া খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। এটি ইনসুলিনের কার্যক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং ডায়াবেটিস সম্পর্কিত অন্যান্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন কিডনি ক্ষতি এবং হার্টের সমস্যা।

দ্রষ্টব্য: উপরের খাবারগুলো আপনি খেতে পারবেন, তবে আপনাকে পরিমাণ কমাতে হবে এবং প্রতিবেলায় খাওয়া যাবে না। এবং কিভাবে তৈরি হচ্ছে এটাও দেখতে হবে

আরো পড়ুন: ডায়াবেটিস রোগীর নিষিদ্ধ খাবার তালিকা: কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?

ডায়াবেটিস রোগীর জন্য কোন ধরনের সবজি নিরাপদ?

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এমন সবজি বেছে নিতে হবে যেগুলোর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম এবং কার্বোহাইড্রেট কম থাকে। নিচের সবজিগুলো নিরাপদ:

১. শাক-সবজি (Leafy Greens): পালং শাক, লাউ শাক, পুঁই শাকের মতো শাকসবজিতে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ কম এবং এতে প্রচুর ফাইবার থাকে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

২. করলা (Bitter Gourd): করলা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে এবং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য প্রাকৃতিক ইনসুলিন হিসেবে কাজ করে।

৩. ফুলকপি (Cauliflower) ও বাঁধাকপি (Cabbage): এই দুই ধরনের সবজিতে কম কার্বোহাইড্রেট এবং উচ্চ ফাইবার রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৪. বেগুন (Eggplant): বেগুনের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম এবং এতে ফাইবার বেশি থাকে, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ।

৫. শশা (Cucumber): শশা কম ক্যালোরি এবং উচ্চ জলের পরিমাণ সম্পন্ন একটি সবজি, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর।

সবজির প্রক্রিয়াকরণের প্রভাব: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য শুধুমাত্র সবজির প্রকার নয়, তার প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ। যেমন:

  • ভাজা খাবার: যেকোনো ধরনের সবজি ভাজা হলে তার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেড়ে যায়। তাই সবজি সেদ্ধ, রান্না বা গ্রিল করে খাওয়াই ভালো।
  • অতিরিক্ত মসলা ও তেল ব্যবহার: মসলাযুক্ত এবং তেলে ভাজা খাবার ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।
  • ফাইবারযুক্ত সবজি: ফাইবারসমৃদ্ধ সবজি রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায় এবং হজম প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।

উপসংহার

ডায়াবেটিস হলে কি কি সবজি খাওয়া যাবে না আশা করি বুঝতে পেরেছেন। ডায়াবেটিস রোগীদের সবজি খাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ সতর্ক থাকতে হবে। সবজি নির্বাচন করার সময় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, কার্বোহাইড্রেট এবং প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতি বিবেচনা করতে হবে। আলু, মিষ্টি কুমড়া, শিম, গাজরের  মতো উচ্চ কার্বোহাইড্রেট যুক্ত সবজি এড়িয়ে চলাই ভালো। অন্যদিকে, শাক-সবজি, করলা, ফুলকপি এবং বেগুনের মতো সবজিগুলো ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং উপকারী।

Scroll to Top