হার্ট অ্যাটাক: কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিকার – জানুন বিস্তারিত

হার্ট অ্যাটাক তখন ঘটে, যখন আমাদের হৃদপিণ্ডে রক্ত যাওয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, হৃদপিণ্ড পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না এবং এর কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মারা যায়। 

আমাদের হৃদপিণ্ড প্রতিনিয়ত রক্ত পাম্প করে সারা শরীরে অক্সিজেন এবং পুষ্টি পৌঁছে দেয়, কিন্তু সেই কাজ করতে নিজেরও রক্ত দরকার হয়। হৃদপিণ্ডে রক্ত পৌঁছে দেয় যে রক্তনালিগুলো, তাদের বলা হয় হার্টের রক্তনালি। এই রক্তনালিগুলোতে যখন চর্বি, রক্তের চর্বি ইত্যাদি জমে যায়, তখন রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং হার্ট অ্যাটাক হয়।

গুরুত্বপূর্ণ: হার্ট অ্যাটাকে লক্ষণ দেখা দিলে অথবা হার্ট অ্যাটাক হলে দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। সুতরাং এর জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান। 

হার্ট অ্যাটাক কত প্রকার?

হার্ট অ্যাটাক মূলত তিন প্রকার, তবে এগুলোর মধ্যে কিছু বেশি গুরুতর এবং কিছু কম গুরুতর রয়েছে। চলুন সহজ ভাষায় এই 3 ধরনের হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে জানি:

১. রক্তনালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া (STEMI): এই ধরনের হার্ট অ্যাটাকে হার্টের রক্তনালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে হার্টে রক্ত যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এ সময় বুকের মাঝখানে প্রচণ্ড ব্যথা, বাম হাতে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরা। অনেক সময় মনে হয় বুকের ওপর কেউ জোরে চাপ দিচ্ছে।

২. রক্তনালি আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়া (NSTEMI): এখানে রক্তনালি পুরোপুরি বন্ধ না হলেও রক্ত চলাচল অনেক কমে যায়। এটি গুরুতর, তবে STEMI-এর মতো বেশি বিপজ্জনক নয়। এ সময় বুকের মাঝখানে হালকা ব্যথা বা চাপ, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, দুর্বলতা। STEMI-এর মতো লক্ষণ থাকলেও ব্যথা তেমন তীব্র নয়।

৩. সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক (Silent Heart Attack): এই ধরনের হার্ট অ্যাটাকে খুব বেশি লক্ষণ দেখা যায় না। অনেক সময় রোগী বুঝতেই পারেন না যে তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। পরে কোনো পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। এই সময় লক্ষণ খুব হালকা হতে পারে, যেমন হালকা অস্বস্তি, ক্লান্তি, বা বুকের সামান্য ব্যথা।

এই তিনটি ধরনই হার্ট অ্যাটাক গুরুতর, তবে STEMI সবচেয়ে বিপজ্জনক। সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাকও অনেক সময় বিপদজনক হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক কেন হয়?

হার্ট অ্যাটাকের কারণ হার্টের রক্তনালিগুলোর ব্লকেজ। তবে আরও কিছু কারণ রয়েছে, যা একে বাড়িয়ে তোলে:

  1. হার্টের রক্তনালিতে চর্বি জমা: এটি হলো হার্ট অ্যাটাকের প্রধান কারণ। যখন রক্তনালীর দেয়ালে রক্তের চর্বি এবং অন্যান্য পদার্থ জমা হতে থাকে, তখন রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে হৃদপিণ্ড পর্যাপ্ত রক্ত পায় না এবং হার্ট অ্যাটাক ঘটে।
  2. রক্ত জমাট বাঁধা: রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে এবং রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এভাবে হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ না থাকলে হার্ট অ্যাটাক ঘটে।
  3. উচ্চ রক্তচাপ: উচ্চ রক্তচাপ হৃদপিণ্ডের  রগগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা রক্তনালীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
  4. ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার: ধূমপান রগগুলোকে সংকুচিত করে, যা রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
  5. ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিসে রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি হলে রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
  6. অতিরিক্ত মানসিক চাপ: দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপের ফলে হরমোনাল পরিবর্তন ঘটে, যা হার্টের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ

হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ কিছু লক্ষণ রয়েছে, তবে লক্ষণগুলো সবার ক্ষেত্রে একইরকম নাও হতে পারে। নারী, পুরুষ এবং বয়স্কদের মধ্যে লক্ষণগুলো ভিন্ন হতে পারে। এখানে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেওয়া হলো:

  1. বুকে তীব্র ব্যথা: বুকের মাঝখানে বা বাম দিকে তীব্র ব্যথা হয়, যা সাধারণত কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়। এবং কিছু সময় পর আবার ফিরে আসে। অনেক সময় এটি চেপে ধরা অনুভূতি হয়, যেমন বুকের ওপর ভারী কিছু চাপ দিচ্ছে।
  2. বাম হাতে বা ঘাড়ে ব্যথা: ব্যথা প্রায়শই বাম হাতে, ঘাড়ে বা পিঠে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
  3. শ্বাসকষ্ট: হঠাৎ করে শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। অনেক সময় এটি ব্যথার সঙ্গে বা ব্যথা ছাড়াও দেখা দেয়।
  4. ঠান্ডা ঘাম হওয়া: হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম হয়। এটি শরীরের প্রচণ্ড চাপের কারণে ঘটে।
  5. মাথা ঘোরা বা বমি বমি: কিছু রোগীর মাথা ঘোরানো বা বমি বমি লাগা, এমনকি বমি হওয়ার মতো অনুভূতি হতে পারে।
  6. অত্যাধিক ক্লান্তি: অনেক রোগী খুব বেশি ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করেন, এমনকি বিশ্রাম  নেওয়ার পরও।
  7. অন্যান্য লক্ষণ: ঘাড়, চোয়াল বা পিঠের ব্যথা; বুকে অস্বস্তি; বমি হওয়া ইত্যাদি লক্ষণও দেখা যেতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক হলে করণীয়

হার্ট অ্যাটাক হলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ যা সঙ্গে সঙ্গে নিতে হবে:

  1. দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া: সময়মতো হাসপাতালে না গেলে হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচার সম্ভাবনা কমে। অ্যাম্বুলেন্সে করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
  2. ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া (ডাক্তারের পরামর্শে): যদি আগের থেকেই ডাক্তারের পরামর্শে অ্যাসপিরিন খাওয়ার পরামর্শ থাকে, তবে হার্ট অ্যাটাক হলে এটি খেতে পারেন। অ্যাসপিরিন রক্তকে পাতলা করতে সাহায্য করে, যা রক্ত প্রবাহে সহায়ক হতে পারে। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া সেবন করবেন না
  3. শরীরকে শান্ত রাখা: রোগীকে শান্ত রাখা এবং বেশি নড়াচড়া না করতে বলাটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উত্তেজনা বা উদ্বেগ পরিস্থিতি খারাপ করতে পারে।
  4. বুকে চাপ দেওয়া (CPR): যদি হার্ট অ্যাটাকের পর কেউ অজ্ঞান হয়ে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে CPR (বুকে চাপ দেওয়া) করতে হবে। বুকে ৩০ বার চাপ দিতে হবে এবং প্রতি দুই চাপের পর দুইবার করে মুখে মুখে শ্বাস দিতে হবে।

হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধের উপায়

জীবনযাপনের কিছু পরিবর্তন এনে হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করা যায়:

  1. সুষম খাদ্য গ্রহণ: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রচুর শাকসবজি, ফলমূল, এবং আঁশযুক্ত খাবার রাখুন এবং চর্বিজাতীয় ও প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলুন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হার্টের রোগীর উপকারী ও ক্ষতিকর খাবার তালিকা দেখুন 
  2. নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন, যা আপনার হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে। 
  3. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা: অতিরিক্ত ওজন হার্টের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা জরুরি। আদর্শ ওজন সম্পর্কে জানতে উচ্চতা অনুযায়ী ওজন চার্ট দেখুন, এতে বুঝতে পারবেন আপনি আদর্শ জন কত হওয়া উচিত!
  4. ধূমপান বন্ধ করা: ধূমপান হার্টের ক্ষতি করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।
  1. রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা: উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়। নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ, এবং নিয়মিত চেকআপের মাধ্যমে এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
  2. মানসিক চাপ কমানো: অতিরিক্ত মানসিক চাপ হৃদপিণ্ডের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই মানসিক চাপ কমানোর জন্য প্রতিদিনের জীবনে কিছু শিথিলকরণ কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন ধ্যান, যোগব্যায়াম, বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম।
  3. পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  4. পর্যাপ্ত জল পান করা: প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন। এটি শরীরে বিভিন্ন কার্যক্রম সঠিকভাবে চালাতে সাহায্য করে, বিশেষ করে রক্ত প্রবাহ ঠিক রাখতে।
  5. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: যাদের বয়স ৪০-এর উপরে, বিশেষ করে যাদের পারিবারিক ইতিহাসে হার্টের সমস্যা রয়েছে, তাদের নিয়মিত হার্টের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। 

উপসংহার:

হার্ট অ্যাটাক একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা, যা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী। তবে, জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন এনে এবং কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গ্রহণ করে আমরা হার্ট অ্যাটাক প্রতিরোধ করতে পারি। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ধূমপান ত্যাগ, এবং মানসিক চাপ কমানো হলো এর প্রধান প্রতিরোধমূলক উপায়। 

এছাড়া, যাদের পারিবারিক ইতিহাসে হার্টের রোগ আছে বা যারা উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো উচিত। তাই, সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন, এবং আপনার হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখুন।

সাধারণ প্রশ্নাবলী(FAQ)

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা কি?

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা হ্যালো যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যান। কারণ হাসপাতালে ডাক্তার চিকিৎসা করবেন। অবশ্যই ভালো এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। কারণ হার্ট অ্যাটাক মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে রোগীর জীবন চলে যেতে পারে।

হার্ট শরীরের কোথায় থাকে?

হার্ট শরীরের বুকের মাঝামাঝি, বাম দিকে হেলে থাকে। এটি দুই ফুসফুসের মাঝখানে অবস্থিত এবং সাধারণত স্তনের পেছনে থাকে।

হার্ট ব্লক কেন হয়?

হার্ট ব্লক ঘটে যখন হৃদয়ের ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যালগুলো ঠিকমতো চলাচল করতে পারে না। এই সমস্যা সাধারণত হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বা ডায়াবেটিসের কারণে দেখা দেয়।

কিভাবে বুঝবেন হার্ট অ্যাটাক হয়েছে?

হার্ট অ্যাটাক হলে বুকে তীব্র ব্যথা বা চাপ অনুভূতি হয়। এছাড়াও শ্বাসকষ্ট, বাম বাহুতে ব্যথা, এবং ঘামতে থাকা লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে।

হার্টের কি কি পরীক্ষা আছে?

হার্টের বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন ইসিজি (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম, এবং স্ট্রেস টেস্ট করা হয়। এছাড়াও কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন পরীক্ষাও করা হতে পারে।

হার্ট অ্যাটাক হলে কি মানুষ মারা যায়?

হার্ট অ্যাটাক হলে যদি দ্রুত চিকিৎসা না করা হয়, তবে তা প্রাণঘাতী হতে পারে। এই অবস্থায় মানুষের মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা থাকে। সঠিক চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যান

মিনি হার্ট অ্যাটাক কি?

মিনি হার্ট অ্যাটাক হল একটি হালকা হার্ট অ্যাটাক, যেখানে হৃদপিণ্ডের কিছু টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত এটি গুরুতর নয়, তবে চিকিৎসা প্রয়োজন।যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যান

Scroll to Top