গর্ভধারণের চতুর্থ সপ্তাহ অনেকটা নতুন জীবনের সূচনার মতো। যদিও এ সপ্তাহে বাহ্যিক কোনো লক্ষণ স্পষ্টভাবে দেখা না গেলেও মায়ের শরীরের অভ্যন্তরে বাচ্চার বিকাশ ও শারীরিক পরিবর্তন শুরু হয়ে গেছে। এই পর্যায়ে, মায়ের শরীর নতুন জীবনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে এবং বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ সপ্তাহের হাইলাইটস
গর্ভাবস্থার চতুর্থ সপ্তাহটি ভ্রূণ রোপণের সপ্তাহ। এটি এমন এক পর্যায়, যেখানে বাচ্চার কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হচ্ছে। এ সময়ে মায়েদের জন্য পুষ্টি গ্রহণ এবং সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আপনার গর্ভাবস্থার পুরোটা সময় কোন ডাক্তার দেখাবেন, এখনই সিদ্ধান্ত নিন
আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট নিয়মিত গ্রহণ করুন
শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক বিকাশের জন্য প্রতিদিন আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট গ্রহণ করা প্রয়োজন (তথ্য: WHO, 2016)।মায়ের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির অভাব বাচ্চার ভবিষ্যত বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ নিন
ধূমপানের প্রভাব এড়িয়ে চলুন
আপনার আশেপাশে যদি কেউ ধূমপান করে, তবে তা আপনার গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই বাসায় ধূমপানের ক্ষেত্রে সচেতনতা অবলম্বন করুন এবং প্রয়োজনে তাদের সাথে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন।
- মাস: ১ মাস
- ত্রৈমাসিক: প্রথম ত্রৈমাসিক
- বাকি সপ্তাহ: ৩৬ সপ্তাহ
৪ সপ্তাহে বাচ্চার বৃদ্ধি

আপনার বাচ্চা এখন প্রায় একটি ছোট্ট শস্য দানার সমান
দৈর্ঘ্য: ২ মিমি
আপনি বাইরে থেকে হয়তো তেমন কিছু অনুভব করতে পারছেন না, কিন্তু আপনার শরীরের ভেতরে অনেক কিছু ঘটছে। গত সপ্তাহে আপনার ডিম্বাণু এবং সঙ্গীর শুক্রাণুর মিলনে যে ভ্রূণ তৈরি হয়েছে, তা এখন নিজেকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে ভ্রূণটি ডিম্বনালি বেয়ে জরায়ুতে চলে এসেছে এবং এই সপ্তাহে তা জরায়ুর গায়ে নিজেদের গেঁথে নিচ্ছে। এখানেই এটি আগামী মাসগুলোতে বৃদ্ধি পেতে শুরু করবে।
চতুর্থ সপ্তাহে, গর্ভস্থ ভ্রূণটি তিনটি প্রধান স্তরে বিভক্ত হয়:
- এক্টোডার্ম – এটি থেকে বাচ্চার মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, ত্বক ও চুল গঠিত হবে।
- মেসোডার্ম – এটি থেকে হৃদপিণ্ড, হাড়, পেশী, এবং রক্তের কোষ তৈরি হবে।
- এন্ডোডার্ম – এর মাধ্যমে ফুসফুস, যকৃত এবং পাচনতন্ত্রের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি হবে (তথ্য: Moore et al., 2018)।
এই স্তরগুলোর গঠন সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টি গ্রহণ এবং ফোলিক অ্যাসিড, আয়রনের মতো ভিটামিন গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন। এই সময়ের ভুল পুষ্টি বা যত্নের অভাব ভবিষ্যতে নিউরাল টিউব ডিফেক্টের মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই সময় প্ল্যাসেন্টা বা গর্ভফুলের প্রাথমিক গঠন শুরু হয়, যা মায়ের শরীর থেকে সরাসরি পুষ্টি ও অক্সিজেন সরবরাহ করবে এবং বর্জ্য পদার্থ দূর করবে।
৪ সপ্তাহে মায়ের শরীর
চতুর্থ সপ্তাহে, মায়ের শরীর হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে শুরু করে। এই পর্যায়ে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন:
- স্তনের সংবেদনশীলতা: প্রোজেস্টেরন ও এস্ট্রোজেন হরমোনের বৃদ্ধির কারণে স্তন ফুলে যেতে পারে এবং স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে।
- ক্লান্তি: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে শরীর অনেক বেশি শক্তি ব্যবহার করে, যা মায়েদের ক্লান্ত অনুভব করাতে পারে।
- মুড সুইং: হরমোনের ওঠানামার ফলে মায়ের মুডে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে।
- সামান্য পেট ব্যথা: ইমপ্ল্যান্টেশনের সময় জরায়ুর গায়ে ভ্রূণের স্থাপন হলে পেটের নিচের দিকে হালকা ব্যথা হতে পারে (তথ্য: Symonds & Arulkumaran, 2019)।
এই পর্যায়ে hCG হরমোনের মাত্রা বাড়তে থাকে, যা মূলত গর্ভধারণের পরীক্ষা পজিটিভ ফল দেওয়ার জন্য দায়ী। বাচ্চার জন্য পুষ্টি ও শক্তি সরবরাহ করার জন্য মায়ের শরীরকে প্রস্তুত করতে এই হরমোন সাহায্য করে।
এ সপ্তাহে বাবার করণীয়
গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই বাবার ভূমিকা মায়ের এবং বাচ্চার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। বাবার ধূমপান গর্ভস্থ শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাবার ধূমপানের ফলে শিশু প্রিম্যাচিউর (আগেভাগে) জন্মগ্রহণ করতে পারে বা শিশুর জন্মের সময় ওজন কম হতে পারে (তথ্য: Wang et al., 2022)। এমনকি দ্বিতীয় হাতের ধূমপানও গর্ভের শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে (তথ্য: Leonardi-Bee et al., 2011)।
তাই বাবাকে ধূমপান ত্যাগ করতে উৎসাহিত করা উচিত এবং মায়ের ধূমপান মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, এই সময়ে বাবার উচিত মানসিকভাবে মাকে সমর্থন করা এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করা, যেমন নিয়মিত হাঁটা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
উপসংহার
গর্ভাবস্থার চতুর্থ সপ্তাহটি নতুন জীবনের শুরু করার একটি সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে বাচ্চার বিকাশ ও মায়ের শরীরের পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গঠন করে। মায়ের যথাযথ পুষ্টি গ্রহণ, স্বাস্থ্যের যত্ন এবং বাবার সহায়তা মিলে বাচ্চার সুস্থ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারে।