গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসকে বলা হয় প্রথম ত্রৈমাসিক (First Trimester)। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়, কারণ এই সময়ে গর্ভস্থ শিশুর সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি হতে শুরু করে। এবং এ সময়ে ৭৫ শতাংশ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। প্রথম ত্রৈমাসিকে মায়ের শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে এবং এই সময় সঠিক যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এখানে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা এবং পরামর্শ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
প্রথম তিন মাসের গর্ভপাতের ঝুঁকির কারণ ও মোকাবেলা:

প্রথম ত্রৈমাসিক গর্ভপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। প্রথম তিন মাসে প্রায় ৭৫ শতাংশ মায়ের গর্ভপাত হয়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে, যেমন: সাধারণত গর্ভপাত ঘটে যখন গর্ভস্থ শিশুর জিনগত বা শারীরিক সমস্যা থাকে। এছাড়াও কিছু শারীরিক বা পরিবেশগত কারণও গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
গর্ভপাতের সম্ভাব্য কারণ:
- জিনগত অস্বাভাবিকতা: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গর্ভপাতের কারণ শিশুর জিনগত সমস্যা হয়, যা অনিয়মিত কোষ বিভাজন থেকে সৃষ্টি হতে পারে।
- হরমোনাল সমস্যা: কিছু মায়ের হরমোনের ভারসাম্যহীনতা থাকে, যা গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- মায়ের অসুস্থতা: মায়ের অতিরিক্ত ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড সমস্যা বা অটোইমিউন রোগ থাকলে গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকে।
- ধূমপান, মাদক, অ্যালকোহল গ্রহণ: ধূমপান, মাদক এবং অ্যালকোহল গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়ায়।
- শিশুর জন্মগত ত্রুটি: গর্ভধারণের প্রথম তিন মাস শিশুর ভ্রূণ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় ধূমপান, মদ্যপান, মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, ক্ষতিকর ওষুধ, যেমন ওয়ারফেরিন, মৃগী বা ক্যান্সারের ওষুধ, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ, এবং রেডিয়েশন শিশুর জন্মগত ত্রুটি তৈরি করতে পারে।
- মোলার প্রেগন্যান্সি:মোলার প্রেগন্যান্সি তখন ঘটে যখন নিষিক্ত ভ্রূণ থেকে বাচ্চা না হয়ে আঙুরের থোকার মতো এক ধরনের টিউমার বৃদ্ধি পায়। সঠিক চিকিৎসা না হলে এটি ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
- জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ: এটি তখন ঘটে যখন নিষিক্ত ভ্রূণ জরায়ুর পরিবর্তে অন্য কোথাও, বিশেষ করে ডিম্বনালিতে বসে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে ডিম্বনালি ফেটে গিয়ে মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারে, যা জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করে।
প্রথম তিন মাসে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কিছু খাদ্য এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ কিছু খাবার ভ্রূণের সঠিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বা মাতৃস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আনারস, পেঁপে (বিশেষ করে কাঁচা পেঁপে), আধা সেদ্ধ বা কাঁচা ডিম, অতিরিক্ত মশলাযুক্ত খাবার, আধা সেদ্ধ বা কাঁচা মাংস, কামরাঙা, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার
গর্ভপাত প্রতিরোধে করণীয়:
গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা, নিজে সতর্ক গুলো অনুসরণ করুন
- প্রি-প্রেগনেন্সি পরীক্ষা: গর্ভধারণের আগে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত, যাতে মায়ের শরীরের স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কোনো সমস্যা থাকলে তা নির্ণয় করা যায়।
- সঠিক পুষ্টি: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং ফলিক অ্যাসিডের পরিমাণ ঠিক রাখা জরুরি, যা শিশুর সঠিক বিকাশে সহায়ক।
- ধূমপান, মাদক, অ্যালকোহল পরিহার: গর্ভধারণের আগে এবং পরে এই সব থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা উচিত।
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলা: কোনো ধরনের অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে যেমন, প্রচণ্ড পেট ব্যথা বা রক্তপাত হলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
- নিষিদ্ধ খাবার: গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াই এমন কিছু নিষিদ্ধ খাবার আছে, এই খাবারগুলো একদমই খাওয়া উচিত নয়।
- যতটা সম্ভব চাপমুক্ত থাকা: মানসিক চাপ গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই রিলাক্সেশনের জন্য যোগব্যায়াম বা মেডিটেশন করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রথম তিন মাসে সন্তানের বিকাশ
গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা রয়েছে, কারণ প্রথম তিন মাস আপনার সন্তানের বিকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই পর্যায়ে শিশুর শরীরের প্রাথমিক আকার ও কাঠামো তৈরি হতে শুরু করে। শিশুর জীবনের এই প্রথম ধাপে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ গঠিত হয়, যা তার ভবিষ্যৎ শারীরিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি স্থাপন করে।
প্রথম ত্রৈমাসিকে আপনার সন্তানের বিকাশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের গঠন
- কানের অভ্যন্তরীণ অংশের বিকাশ
- কার্ডিয়াক টিস্যু (হৃদপিণ্ডের টিস্যু)
- যৌনাঙ্গের প্রাথমিক কাঠামো
- আঙুলের নখ
- যকৃৎ এবং এর কার্যক্রম
- চোখের পাতা এবং অন্যান্য চোখের অংশ
- অগ্ন্যাশয় ও কিডনি
- হাত ও পায়ের জন্য কার্টিলেজ গঠন
- মুখ, চোখ ও নাকের পেশী
- আঙুল ও পায়ের আঙুলের বিকাশ
- শ্বাসতন্ত্রের প্রাথমিক গঠন
এই সময়ের মধ্যে ভ্রূণের বিকাশ উল্লেখযোগ্য হারে পরিবর্তিত হতে পারে। প্রথম মাসের শেষে আপনার সন্তানের দৈর্ঘ্য প্রায় ০.৬৪ সেন্টিমিটার (০.২৫ ইঞ্চি), যা একটি ছোট চালের দানার সমান। গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহ শেষে শিশুটি প্রায় ১০ সেন্টিমিটার (৪ ইঞ্চি) লম্বা হয় এবং ওজন হয় প্রায় ২৮ গ্রাম।
গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিকর খাদ্য তালিকা:

গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা হিসেবে খাবারের সতর্কতা হওয়া উচিত। কারণ প্রথম তিন মাসে আপনার সন্তানের শরীরের বিভিন্ন অংশ বিকাশ ঘটবে, সুতরাং এ সময় এবং গর্ভকালীন সময়ে আপনার কিছু পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে, যেমন:
১. ফলিক অ্যাসিড (ফোলেট): ফলিক অ্যাসিড বা ভিটামিন বি৯ শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের সঠিক বিকাশে সহায়তা করে। এটি গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে স্নায়বিক ত্রুটি (Neural Tube Defects) প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গর্ভবতী মায়ের প্রতিদিন ৪০০-৮০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড প্রয়োজন।
- খাদ্য উৎস: পালং শাক, ব্রকলি, ডাল, কমলালেবু, এবং ফোলেট সমৃদ্ধ খাদ্য।
২. প্রোটিন: প্রোটিন শিশুর কোষ গঠন ও মায়ের শক্তির চাহিদা পূরণে সাহায্য করে।
- খাদ্য উৎস: মুরগির মাংস, ডাল, ডিম, মাছ, বাদাম, এবং দুধ।
৩. আয়রন: আয়রন মায়ের রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক রাখে এবং শিশুর জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করে। গর্ভাবস্থায় আয়রনের দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২৭ মিলিগ্রাম।
- খাদ্য উৎস: লাল মাংস, পালং শাক, লেবু জাতীয় ফল, এবং ডাল।
৪. ক্যালসিয়াম: শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠন সঠিকভাবে করতে ক্যালসিয়াম অপরিহার্য।
- খাদ্য উৎস: দুধ, দই, চিজ, ব্রকলি, এবং ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ ফল।
৫. ভিটামিন ডি: ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করতে ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- খাদ্য উৎস: সূর্যালোক, মাছের তেল, ডিমের কুসুম।
এই আর্টিকেলের মাধ্যমে গর্ভবতী মায়ের প্রথম তিন মাসের সতর্কতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে মায়ের সঠিক যত্ন ও সচেতনতা গর্ভাবস্থার সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।